দক্ষিণের খবর | www.dokkhinerarthonity.com
দক্ষিণের খবর ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ১৭ মে ২০২৬, ০৮:৪৩ পিএম
আপডেট: রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬, ১১:২০ এএম
কিন্তু প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে সেই চিত্র দ্রুত বদলাতে শুরু করেছে। এখন মোবাইল ফোন বা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করেই ঋণের আবেদন, যাচাই-বাছাই এবং অনুমোদনের পর অর্থ বিতরণ—সবকিছু সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে। এই নতুন ব্যবস্থার নামই “ই-লোন” বা ডিজিটাল ঋণ।
বাংলাদেশে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে এই সেবা সম্প্রসারণ করছে। চলতি বছরের ১১ মে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারার আওতায় ডিজিটাল ঋণসংক্রান্ত একটি নীতিমালা বা সার্কুলার জারি করে, যার মাধ্যমে দেশের সব তফসিলি ব্যাংককে ই-লোন সেবা চালুর আনুষ্ঠানিক সুযোগ দেওয়া হয়। এই নির্দেশনার ফলে ডিজিটাল মাধ্যমে ঋণ বিতরণের একটি কাঠামোগত ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
নীতিমালা অনুযায়ী, ই-লোনের ক্ষেত্রে গ্রাহককে ব্যাংকে শারীরিকভাবে উপস্থিত হতে হবে না। মোবাইল অ্যাপ, ওয়েবসাইট বা ব্যাংকের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে গ্রাহক আবেদন করতে পারবেন। ব্যাংক গ্রাহকের লেনদেন ইতিহাস, আয়-ব্যয়ের তথ্য, ক্রেডিট স্কোর এবং অন্যান্য ডিজিটাল ডেটা বিশ্লেষণ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঋণ অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ই-লোন আসলে কোনো আলাদা ঋণ শ্রেণি নয়; এটি মূলত ঋণ বিতরণের একটি ডিজিটাল পদ্ধতি। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই), কটেজ, মাইক্রো, স্মল ও মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজ—এই সিএমএসএমই খাতের মধ্যেই ই-লোন কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
বাংলাদেশে ই-লোনের ধারণা একেবারে নতুন নয়। মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে সীমিত পরিসরে ইতোমধ্যেই ডিজিটাল ঋণ বিতরণ কার্যক্রম চলছিল। উদাহরণ হিসেবে, বিকাশ ও সিটি ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণ করা হচ্ছে, যা শুরুতে ২০ হাজার টাকা থাকলেও পরবর্তীতে ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। তবে নতুন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্কুলারের ফলে এই ধরনের সেবা এখন শুধু নির্দিষ্ট অংশীদারিত্বভিত্তিক নয়, বরং সব ব্যাংকের জন্য উন্মুক্ত হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এই ঋণসেবার নাম অবশ্যই “ই-লোন” হবে এবং একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন। ঋণের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে সর্বোচ্চ ১২ মাস। সুদের হার বাজারভিত্তিক হবে, তবে যদি কোনো ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার আওতায় এই ঋণ প্রদান করে, তাহলে সুদের হার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।
এক্ষেত্রে ঋণ বিতরণের পুরো প্রক্রিয়া হবে সম্পূর্ণ কাগজবিহীন (paperless)। গ্রাহকের সম্মতি নেওয়া হবে বায়োমেট্রিক যাচাই এবং টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশনের মাধ্যমে। অর্থাৎ আলাদা কোনো কাগজে স্বাক্ষরের প্রয়োজন হবে না। ডিজিটাল মাধ্যমেই চুক্তি সম্পন্ন হবে।
তবে ঋণ দেওয়ার আগে ব্যাংকগুলো বাধ্যতামূলকভাবে সেন্ট্রাল ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি) রিপোর্ট যাচাই করবে। পাশাপাশি অন্য ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস থেকে নেওয়া ঋণের তথ্যও সংগ্রহ করতে হবে। নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কোনো ঋণখেলাপি এই সুবিধা পাবেন না।
এছাড়া ই-লোনের ক্ষেত্রে সিআইবি যাচাই ফি বা অতিরিক্ত কোনো চার্জ গ্রাহকের ওপর আরোপ করা যাবে না।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ই-লোন বাংলাদেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হতে পারে। বিশেষ করে যারা ব্যাংকের শাখায় যেতে পারেন না—ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, নিম্ন আয়ের মানুষ, তরুণ উদ্যোক্তা বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী—তাদের জন্য এটি সহজ ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ তৈরি করবে।
বেসিসের সাবেক সভাপতি ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ফাহিম মাশরুর মনে করেন, এই ব্যবস্থাটি নতুন নয়, বরং বিদ্যমান ডিজিটাল ঋণ ব্যবস্থারই সম্প্রসারিত রূপ। তার মতে, ই-লোন মূলত একটি “প্রসেস”, কোনো আলাদা ঋণ ক্যাটাগরি নয়। তিনি বলেন, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকলেই অনেক গ্রাহক এই সেবার আওতায় আসতে পারবেন, যা ক্রেডিট কার্ড বা প্রচলিত ক্ষুদ্র ঋণের তুলনায় তুলনামূলকভাবে সহজ।
অন্যদিকে ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো গতি ও সহজলভ্যতা। যেখানে প্রচলিত ঋণ পেতে দিন বা সপ্তাহ লেগে যায়, সেখানে ই-লোনে কয়েক মিনিট বা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সিদ্ধান্ত পাওয়া সম্ভব।
তবে একই সঙ্গে ঝুঁকির দিকও রয়েছে বলে সতর্ক করছেন বিশ্লেষকরা। যেহেতু এই ঋণ জামানতবিহীন, তাই খেলাপির ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে। প্রযুক্তিনির্ভর অটোমেটেড সিস্টেমে যদি যথাযথ যাচাই না থাকে, তাহলে ক্রেডিট ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
ফাহিম মাশরুর এ প্রসঙ্গে বলেন, ব্যাংক যদি ১০০ জনকে ঋণ দেয়, তার মধ্যে একটি অংশ ফেরত না দিলে ব্যাংকের ক্ষতি হবে। তাই ঝুঁকি মোকাবিলায় সুদের হার ও স্কোরিং সিস্টেম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তার মতে, আন্তর্জাতিকভাবে এই ধরনের ডিজিটাল ক্ষুদ্র ঋণে তুলনামূলকভাবে উচ্চ সুদের হার দেখা যায়, যাতে ঝুঁকি কাভার করা যায়।
অন্যদিকে সাবেক ব্যাংক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নূরুল আমিন মনে করেন, ই-লোনের মাধ্যমে আর্থিক সেবার পরিসর বাড়বে এবং যারা সাধারণত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকেন, তারা অন্তর্ভুক্ত হবেন। তবে তিনি এটিকে নতুন কোনো ঋণ নয়, বরং বিদ্যমান ঋণ ব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তর হিসেবে দেখছেন।
নীতিনির্ধারকদের মতে, ই-লোনের মাধ্যমে দেশে ক্যাশলেস লেনদেন বাড়বে এবং ডিজিটাল আর্থিক সেবার ব্যবহার আরও বিস্তৃত হবে। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে প্রযুক্তিনির্ভরতা বাড়িয়ে দক্ষতা ও স্বচ্ছতা আনার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে বিশেষজ্ঞদের অভিমত, শুধু প্রযুক্তি চালু করলেই সফলতা আসবে না; বরং গ্রাহক সুরক্ষা, তথ্য নিরাপত্তা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং সঠিক মনিটরিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় দ্রুত ঋণ বিতরণের সুবিধা ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে ই-লোন বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল রূপান্তরের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা একদিকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে পারে, অন্যদিকে যথাযথ নিয়ন্ত্রণ না থাকলে নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি করতে পারে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক: মো. সরোয়ার হোসেন মিঠু
নির্বাহী সম্পাদক: ইমতিয়াজ আহমেদ
বার্তা সম্পাদক: নাজমুল হোসেন লাভলু
ডিজিটাল ইনচার্জ: মো.সোবাহান মিয়া
Email: dokkhinerkhobor@gmail.com
Publisher & Editor In Chief:
Contact No:+880 1717607442
Address: Shibchar Powro Super Market, 2nd Flor, Shop No.44, Shibchar Sadar, Madaripur.
স্বত্ব দক্ষিণের খবর
Developed by Vida Team