দক্ষিণের খবর | www.dokkhinerarthonity.com
দক্ষিণের খবর ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬, ১২:২৪ পিএম
আপডেট: রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬, ১১:২০ এএম
প্রথম দিনের বৈঠকে শীর্ষ ব্যবসায়িক নেতাদের উপস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী বক্তব্য দেওয়া হয়। তবে এখনো পর্যন্ত কোনো বড় বাণিজ্য চুক্তি বা উল্লেখযোগ্য ব্যবসায়িক সমঝোতার ঘোষণা আসেনি।
বৃহস্পতিবার শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দুই ঘণ্টার বেশি সময় বৈঠক করেন ট্রাম্প। এ সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ককে “বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পর্ক” হিসেবে উল্লেখ করেন।
হোয়াইট হাউস বৈঠকটিকে “অত্যন্ত ফলপ্রসূ” বলে বর্ণনা করেছে। বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপল–এ বক্তব্য দিতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, এটি সম্ভবত “এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় শীর্ষ বৈঠক”।
এর আগে দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত দুই দেশের বাণিজ্য আলোচনায় “অগ্রগতি” হয়েছে বলে মন্তব্য করেন শি জিনপিং। তবে একই সঙ্গে তিনি তাইওয়ান ইস্যুতে সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, “এটি ভুলভাবে মোকাবিলা করা হলে দুই দেশ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে পারে, এমনকি সরাসরি দ্বন্দ্বেও যেতে পারে।”
প্রযুক্তি ও বাণিজ্য
এই সফরে বাস্তব ফলাফলের পাশাপাশি প্রতীকী বার্তাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত একটি মুহূর্ত ছিল বেইজিংয়ে এয়ার ফোর্স ওয়ানের অবতরণ।
প্রেসিডেন্টের বিমান থেকে জ্যেষ্ঠ মন্ত্রিপরিষদ সদস্য পিট হেগসেথ, মার্কো রুবিও এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রির–এর আগে নেমে আসেন ইলন মাস্ক। এতে সফরটি শুরু থেকেই বাণিজ্যকেন্দ্রিক হিসেবে বিবেচিত হয়।
স্বাগত অনুষ্ঠানের সময়ও ট্রাম্পের কাছাকাছি ছিলেন মাস্ক এবং জেনসেন হুয়াং।
এই প্রতীকী উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্র-চীন অর্থনৈতিক সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর খাত—বৈদ্যুতিক যানবাহন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তির গুরুত্বকে সামনে নিয়ে আসে।
টেসলা–র সাংহাই গিগাফ্যাক্টরি এবং চীনা বাজারের ওপর নির্ভরতা রয়েছে। অন্যদিকে এনভিডিয়া–র চিপ বৈশ্বিক এআই প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে অবস্থান করছে। একই সঙ্গে উন্নত কম্পিউটিং প্রযুক্তিতে চীনের প্রবেশাধিকার সীমিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ নীতিরও মূল লক্ষ্য এই খাত।
বিশেষ করে জেনসেন হুয়াংয়ের উপস্থিতিকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ তিনি মূল প্রতিনিধিদলের তালিকায় ছিলেন না। এতে ধারণা করা হচ্ছে, এআই ও চিপ প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা প্রত্যাশার চেয়েও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
পরে ফক্স নিউজ–কে ট্রাম্প বলেন, “চীন ওইসব মানুষের সঙ্গে শত শত বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ করবে।” তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলে বোয়িং–এর প্রধান নির্বাহী কেলি অর্টবার্গও ছিলেন।
একই সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, চীন ২০০টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। প্রায় এক দশকের মধ্যে এটিই হবে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি বাণিজ্যিক উড়োজাহাজের প্রথম বড় চীনা ক্রয়।
তবে বিশ্লেষকদের প্রত্যাশার তুলনায় এ সংখ্যা কম বলে মনে করা হচ্ছে। মন্তব্যটি প্রচারের পর বোয়িংয়ের শেয়ারের দাম চার শতাংশেরও বেশি কমে যায়।
বড় কোনো চুক্তি নয়
সব আয়োজন ও কূটনৈতিক প্রদর্শনের পরও বড় কোনো বাণিজ্য চুক্তি বা কাঠামোগত সমঝোতা হয়নি।
এর পরিবর্তে উভয় পক্ষ অক্টোবরের বাণিজ্য যুদ্ধবিরতির ধারাবাহিকতার কথাই তুলে ধরেছে। ওই সমঝোতার আওতায় ওয়াশিংটন চীনা পণ্যের ওপর বড় ধরনের শুল্ক বৃদ্ধি স্থগিত করে এবং বেইজিং বিরল খনিজ রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ থেকে সরে আসে।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, দুই নেতা একটি “বোর্ড অব ট্রেড” গঠনে সম্মত হয়েছেন, যার মাধ্যমে নতুন করে শুল্ক আলোচনা শুরু না করেই দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্ক পরিচালনা করা হবে।
ওয়াশিংটনের পক্ষে বাণিজ্য আলোচনা নেতৃত্ব দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ব্যবসায়িক সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি–কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ সহায়তার জন্য কার্যকর কাঠামো গঠনে অগ্রগতির আশা প্রকাশ করেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, এসব ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর করতে এখনো অনেক কাজ বাকি রয়েছে।
বাজারে প্রবেশাধিকার ও সহযোগিতা
হোয়াইট হাউসের তথ্য অনুযায়ী, আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর জন্য চীনা বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শিল্পখাতে চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল।
বেইজিং ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য ও জ্বালানি পণ্যের আমদানি বাড়াবে।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকেরা দীর্ঘদিন ধরে সয়াবিন, গরুর মাংস ও পোলট্রি পণ্যের জন্য চীনা বাজারে আরও বেশি প্রবেশাধিকার চেয়ে আসছেন। তবে এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
স্কট বেসেন্ট বলেন, সয়াবিন সংক্রান্ত কিছু প্রতিশ্রুতি আগের চুক্তির আওতায় ইতোমধ্যেই সমাধান হয়েছে। তবে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে চীনের।
অন্যদিকে জেমিসন গ্রির বলেছেন, চলতি বছরের মধ্যেই একটি কৃষি চুক্তি হওয়ার আশা করছেন তিনি।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিনহুয়া–র তথ্য অনুযায়ী, শি জিনপিং যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়িক নেতাদের বলেছেন, চীনের “দরজা আরও উন্মুক্ত হবে” এবং মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য “আরও বিস্তৃত সম্ভাবনা” তৈরি হবে।
তিনি বাণিজ্য, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন ও আইন প্রয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে “পারস্পরিকভাবে লাভজনক” বলেও উল্লেখ করেন।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, চীন এখনো যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর জন্য একদিকে বড় বাজার হলেও অন্যদিকে নিয়ন্ত্রণনীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে কঠিন ব্যবসায়িক পরিবেশ হিসেবেই রয়ে গেছে।
‘সবচেয়ে স্পর্শকাতর’ ইস্যু
এই বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো—বেইজিং এখন তাইওয়ান ইস্যুকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৃহত্তর অর্থনৈতিক সম্পর্কের সঙ্গে আরও সরাসরি যুক্ত করছে।
গত এক বছরে সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি, যুক্তরাষ্ট্র-তাইওয়ান বাণিজ্য সম্পর্ক এবং তাইপের কাছে অস্ত্র বিক্রি নিয়ে উত্তেজনা বাড়লেও এবার তাইওয়ানকে সরাসরি অর্থনৈতিক আলোচনার অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
চীনের প্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী, শি জিনপিং বলেছেন, উভয় পক্ষ “গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীলতা”–র ভিত্তিতে সম্পর্কের জন্য নতুন অবস্থানে সম্মত হয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, তাইওয়ান এখনো সবচেয়ে স্পর্শকাতর ইস্যু।
চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, শি বলেন, “তাইওয়ান প্রশ্নটি চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।”
তিনি আরও বলেন, “এটি ভুলভাবে মোকাবিলা করা হলে দুই দেশ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে পারে, এমনকি সরাসরি দ্বন্দ্বেও পৌঁছাতে পারে।”
অমীমাংসিত বিভাজন
প্রযুক্তি এখনো যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিভাজনের ক্ষেত্র হিসেবে রয়ে গেছে।
উন্নত সেমিকন্ডাক্টর ও চিপ তৈরির সরঞ্জাম রপ্তানির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণনীতি এখনো বহাল রয়েছে। এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য অত্যাধুনিক এআই সক্ষমতায় চীনের প্রবেশাধিকার সীমিত করা।
অন্যদিকে বেইজিং উন্নত প্রযুক্তিতে আরও বেশি প্রবেশাধিকার চেয়ে যাচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নীতিকে তাদের শিল্পোন্নয়ন সীমিত করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছে।
এআই এই বৈঠকের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে বলে ধারণা করা হলেও, প্রথম দিনের প্রকাশিত বিবরণে এ বিষয়ে সরাসরি কোনো উল্লেখ ছিল না।
স্কট বেসেন্ট বলেন, প্রতিনিধি দলগুলো এআই নিরাপত্তা কাঠামো বা “গার্ডরেইল” নিয়ে আলোচনা করছে।
তিনি বলেন, “আমরা উদ্ভাবনকে বাধাগ্রস্ত করতে চাই না। তাই এমন নীতি নির্ধারণ জরুরি, যাতে সর্বাধিক উদ্ভাবন ও সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।”
এদিকে আলোচনায় অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের আশা ছিল, ইরান সংঘাত ও তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে চীনের সহযোগিতা পাওয়া যাবে।
হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ বিঘ্ন ও তেলের দামের অস্থিরতায় চীনের আমদানি ব্যয় বেড়েছে এবং বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্প বলেছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি–তে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ইরানকে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে চীন তার প্রভাব ব্যবহার করতে পারে।
চীনের প্রকাশিত বিবরণে মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা উল্লেখ করা হলেও বিস্তারিত জানানো হয়নি।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বেইজিংয়ে ট্রাম্পের সম্মানে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে তিনি শি জিনপিংকে আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানান।
ওই বৈঠকের আগে দুই পক্ষের মধ্যে আরও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। বিশ্লেষকদের আশা, বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতি ভবিষ্যতে এমন একটি বড় বাণিজ্যিক অগ্রগতিতে পৌঁছাতে পারবে, যা এবার অর্জিত হয়নি।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক: মো. সরোয়ার হোসেন মিঠু
নির্বাহী সম্পাদক: ইমতিয়াজ আহমেদ
বার্তা সম্পাদক: নাজমুল হোসেন লাভলু
ডিজিটাল ইনচার্জ: মো.সোবাহান মিয়া
Email: dokkhinerkhobor@gmail.com
Publisher & Editor In Chief:
Contact No:+880 1717607442
Address: Shibchar Powro Super Market, 2nd Flor, Shop No.44, Shibchar Sadar, Madaripur.
স্বত্ব দক্ষিণের খবর
Developed by Vida Team