দক্ষিণের খবর | www.dokkhinerarthonity.com
দক্ষিণের খবর ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ১৭ মে ২০২৬, ০৮:৪৫ পিএম
আপডেট: সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬, ০৫:০৮ পিএম
ভারতের দাবি অনুযায়ী, ওই হামলার লক্ষ্য ছিল “সন্ত্রাসবাদীদের শিবির”, যা সীমান্তপারের হুমকি মোকাবিলার অংশ হিসেবে পরিচালিত হয়।
ঘটনার সূত্রপাত হয় ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল, যখন ভারতশাসিত কাশ্মীরের পহেলগামে বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ জন পর্যটক এবং একজন স্থানীয় বাসিন্দা নিহত হন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারত দ্রুত পাকিস্তানের ভেতরে সামরিক অভিযান চালায়, যার নাম দেওয়া হয় “অপারেশন সিন্দুর”।
ভারত সরকারের দাবি ছিল, এই হামলার পেছনে “পাকিস্তানভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর” ভূমিকা রয়েছে। তবে পাকিস্তান এসব অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করে এবং দাবি করে যে তারা ঘটনার সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নয়।
এরপর ২০২৫ সালের ৭ থেকে ১০ মে পর্যন্ত দুই পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশীর মধ্যে সীমিত সামরিক সংঘাত হয়, যা সামরিক বিশ্লেষকদের মতে দক্ষিণ এশিয়ায় যুদ্ধকৌশলের একটি নতুন অধ্যায় খুলে দেয়। বিশেষজ্ঞদের অনেকেই এই সংঘাতকে প্রথম কার্যকর “ড্রোন যুদ্ধ” হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে প্রচলিত যুদ্ধাস্ত্রের পাশাপাশি ব্যাপকভাবে মানববিহীন আকাশযান বা ড্রোন ব্যবহৃত হয়।
এই সংঘাতে “ইহা”, “হারোপ” এবং “সংগার”-এর মতো বিভিন্ন ধরনের আনম্যানড এরিয়াল সিস্টেম ব্যবহারের তথ্য সামনে আসে। এসব প্রযুক্তি মূলত নজরদারি, আক্রমণ এবং লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করার জন্য ব্যবহৃত হয়।
ড্রোন প্রযুক্তি নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর দ্রুত উন্নয়ন যুদ্ধক্ষেত্রের কৌশলকে আমূল বদলে দিয়েছে। কম খরচ, সহজ নিয়ন্ত্রণ, দূর থেকে পরিচালনার সক্ষমতা এবং উচ্চ নির্ভুলতার কারণে ড্রোন এখন আধুনিক সামরিক ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠছে।
আফগানিস্তান, ইয়েমেন এবং ইউক্রেন যুদ্ধসহ বিভিন্ন সংঘাতে ড্রোন ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে, যেখানে প্রচলিত বিমান হামলার তুলনায় এটি অনেক বেশি নমনীয় ও ঝুঁকিমুক্ত বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সীমান্তে ক্রমবর্ধমান ড্রোন ব্যবহার
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত পাকিস্তান সীমান্তে ভারতের ৩৩২৩ কিলোমিটার এলাকায় ১৮১৬টি ড্রোন শনাক্ত করা হয়। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের দাবি, এসব ড্রোনের মাধ্যমে অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং মাদক পাচারের চেষ্টা করা হচ্ছিল।
অন্যদিকে পাকিস্তানও সীমান্ত এলাকায় ড্রোন ব্যবহারের অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছে। দুই দেশই একে অপরকে নজরদারি এবং আক্রমণমূলক ড্রোন ব্যবহারের জন্য দায়ী করে আসছে।
ড্রোন এখন শুধু যুদ্ধের হাতিয়ার নয়, বরং সীমান্তপারের অপরাধ, পাচার এবং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমেও পরিণত হয়েছে।
২০২১ সালের জুনে জম্মুর একটি বিমানঘাঁটিতে বিস্ফোরণের ঘটনায় ড্রোন ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। যদিও তখন বড় কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি, তবে ঘটনাটি ভারতের সামরিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
যুদ্ধকৌশলে পরিবর্তন ও প্রতিরক্ষা প্রতিক্রিয়া
ভারতীয় বিমান বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য ছিল যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার ও ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করা। কিন্তু এখন ছোট, মাঝারি এবং বড়—সব ধরনের ড্রোন শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয় করা নতুন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভারত এখন বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলছে, যেখানে ইলেকট্রনিক জ্যামিং, রাডার-ভিত্তিক শনাক্তকরণ, কাইনেটিক ইন্টারসেপ্টর এবং প্রচলিত বিমান প্রতিরক্ষা কামান একসঙ্গে ব্যবহার করা হচ্ছে।
প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (DRDO)-এর সাবেক চেয়ারম্যান ড. জি সতীশ রেড্ডি জানিয়েছেন, সমন্বিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে বড় ধরনের ড্রোন হামলা প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এই প্রযুক্তিগুলোর ব্যয় অত্যন্ত বেশি, যা দীর্ঘমেয়াদে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
ভারতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা আরও বলেন, “সস্তা ড্রোন ধ্বংস করতে ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা বাস্তবসম্মত নয়। তাই নতুন সমাধান খুঁজতে হচ্ছে।”
এয়ার মার্শাল একে ভারতী বলেছেন, স্বল্পমূল্যের ড্রোন কেবল হয়রানিমূলক হামলার জন্য কার্যকর হতে পারে, কিন্তু বড় কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের জন্য উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্র প্রয়োজন, যেমন উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ক্ষেপণাস্ত্র ও উন্নত আক্রমণক্ষম ড্রোন।
পাকিস্তানের অবস্থান ও কৌশল
পাকিস্তানের সামরিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা দাবি করছেন, সাম্প্রতিক সংঘাতে ভারতের ড্রোন হামলার একটি বড় অংশ প্রতিহত করা হয়েছে। তাদের মতে, দেশটি এখন কাইনেটিক (ভৌত ধ্বংস) এবং নন-কাইনেটিক (ইলেকট্রনিক ও সাইবার) উভয় ধরনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করছে।
পাকিস্তান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে প্রচলিত বিমান হামলার পরিবর্তে ড্রোন ব্যবহারে জোর দিচ্ছে। কারণ ড্রোনের মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সময় পারিপার্শ্বিক ক্ষয়ক্ষতি তুলনামূলকভাবে কম হয়।
বিশ্লেষক সৈয়দ মুহাম্মদ আলী বলেন, ড্রোন এখন শুধু যুদ্ধ নয়, বরং গোয়েন্দা অভিযান এবং সীমান্ত নিরাপত্তার একটি মূল অংশ হয়ে উঠেছে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও প্রযুক্তির বিস্তার
ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (IISS)-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামোতে বড় পরিবর্তন এনেছে।
মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউক্রেন যুদ্ধ দেখিয়েছে, কীভাবে ছোট এবং স্বল্পমূল্যের ড্রোন বড় সামরিক শক্তিকেও চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে। বিশেষ করে “সোয়ার্ম ড্রোন” বা একাধিক ড্রোন একসঙ্গে আক্রমণ করার কৌশল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য নতুন সংকট তৈরি করেছে।
এমন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশ এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) নির্ভর ড্রোন, স্বয়ংক্রিয় লক্ষ্য শনাক্তকরণ ব্যবস্থা এবং উন্নত ইলেকট্রনিক যুদ্ধ প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে।
সামরিক ব্যয় ও অস্ত্র প্রতিযোগিতা
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (SIPRI)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারত সামরিক খাতে প্রায় ৯২১০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে, যা বিশ্বে পঞ্চম সর্বোচ্চ। পাকিস্তানের ব্যয় ছিল প্রায় ১১৯০ কোটি ডলার।
এই বিশাল ব্যয়ের বড় অংশই এখন ড্রোন, আকাশ প্রতিরক্ষা এবং গোয়েন্দা প্রযুক্তি উন্নয়নে ব্যবহার হচ্ছে।
ভারত যুক্তরাষ্ট্র থেকে MQ-9B ধরনের দীর্ঘসময় আকাশে অবস্থান করতে সক্ষম ড্রোন কেনার চুক্তি করেছে। এই ড্রোনগুলো নজরদারি, সমুদ্র নিরাপত্তা এবং আক্রমণমূলক অভিযানে ব্যবহৃত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে পাকিস্তান তুরস্ক ও চীন থেকে বায়রাক্তার TB-2, উইং লুং-২ এবং অন্যান্য সশস্ত্র ড্রোন সংগ্রহ করেছে। এসব ড্রোন দীর্ঘসময় আকাশে থাকতে পারে এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।
ভবিষ্যতের যুদ্ধ ও প্রযুক্তিগত দিক
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্র হবে ড্রোননির্ভর, যেখানে মানবচালিত যুদ্ধবিমান ধীরে ধীরে কম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে “সোয়ার্ম ড্রোন” প্রযুক্তি, যেখানে একসঙ্গে বহু ড্রোন সমন্বিতভাবে আক্রমণ চালাতে পারে, সেটি যুদ্ধের ধরন পুরোপুরি বদলে দিতে পারে।
ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশই এখন ড্রোন প্রশিক্ষণকে সামরিক শিক্ষার মূল অংশে যুক্ত করছে। প্রতিটি সৈন্যকে ড্রোন পরিচালনা, নজরদারি এবং ড্রোন প্রতিরোধ শেখানোর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
ভারতের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ভবিষ্যতে প্রতিটি ইউনিটে ড্রোন বিশেষজ্ঞ রাখা হবে, যাতে যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ও বিশ্লেষকদের সতর্কতা
তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে, ড্রোন প্রযুক্তি যুদ্ধকে কম সহিংস না করে বরং আরও দ্রুত এবং অনিশ্চিত করে তুলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ড্রোন হামলা শনাক্ত করা কঠিন হওয়ায় ভুল বোঝাবুঝি ও দ্রুত পাল্টা প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়, যা পারমাণবিক শক্তিধর দুই দেশের মধ্যে সংঘাতকে আরও বিপজ্জনক করে তুলতে পারে।
একজন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকের ভাষায়, এখন মূল প্রশ্ন হলো—ড্রোন কি যুদ্ধকে তুলনামূলকভাবে কম ধ্বংসাত্মক করছে, নাকি এটি ভবিষ্যতের বড় ও আরও জটিল সংঘাতের সূচনা মাত্র।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক: মো. সরোয়ার হোসেন মিঠু
নির্বাহী সম্পাদক: ইমতিয়াজ আহমেদ
বার্তা সম্পাদক: নাজমুল হোসেন লাভলু
ডিজিটাল ইনচার্জ: মো.সোবাহান মিয়া
Email: dokkhinerkhobor@gmail.com
Publisher & Editor In Chief:
Contact No:+880 1717607442
Address: Shibchar Powro Super Market, 2nd Flor, Shop No.44, Shibchar Sadar, Madaripur.
স্বত্ব দক্ষিণের খবর
Developed by Vida Team