দক্ষিণের খবর | www.dokkhinerarthonity.com
দক্ষিণের খবর ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ১৭ মে ২০২৬, ০৮:৪৭ পিএম
আপডেট: রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬, ১১:২০ এএম
১৯৯১ সালে চীনের ফুজিয়ান প্রদেশের জিনজিয়াং শহরে অ্যানটা আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। তখন এটি ছিল একটি ছোট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, যা মূলত অন্য ব্র্যান্ডের জন্য জুতা তৈরি করত। তবে চীনের উপকূলীয় অঞ্চলে শিল্পনীতি পরিবর্তন, বিদেশি বিনিয়োগ এবং বিশেষায়িত উৎপাদন অঞ্চল গড়ে ওঠার ফলে জিনজিয়াং দ্রুতই একটি বড় জুতা উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পায়। হাজার হাজার কারখানা, কাঁচামাল সরবরাহকারী এবং লজিস্টিক কোম্পানির সমন্বয়ে গড়ে ওঠে একটি শক্তিশালী শিল্পজাল।
এই পরিবেশই অ্যানটার মতো কোম্পানিকে দ্রুত বড় হতে সাহায্য করে। বিদেশি ব্র্যান্ডের জন্য বৃহৎ পরিসরে কম খরচে জুতা উৎপাদন করতে করতে প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে নিজস্ব ব্র্যান্ড তৈরির দিকে এগোয়। তারা চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে খুচরা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে এবং বিভিন্ন ক্রীড়া ইভেন্ট, জাতীয় অ্যাথলেট ও টুর্নামেন্টের সঙ্গে অংশীদারিত্ব করে ব্র্যান্ড পরিচিতি বাড়াতে থাকে।
২০০৭ সালে অ্যানটা হংকং স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয় এবং বড় অঙ্কের মূলধন সংগ্রহ করে, যা তাদের সম্প্রসারণকে আরও ত্বরান্বিত করে। এরপর তারা ধীরে ধীরে বৈশ্বিক কৌশলের দিকে অগ্রসর হয়, যেখানে মূল লক্ষ্য ছিল শুধু উৎপাদনকারী নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ বৈশ্বিক ব্র্যান্ডে পরিণত হওয়া।
অ্যানটার সবচেয়ে বড় কৌশলগত পরিবর্তন আসে অধিগ্রহণ ও ব্র্যান্ড পোর্টফোলিও সম্প্রসারণের মাধ্যমে। তারা ইতালির ফিলা ব্র্যান্ড অধিগ্রহণ করে, যা ইউরোপীয় বাজারে তাদের প্রবেশ সহজ করে। পরবর্তীতে ফিনল্যান্ডভিত্তিক আমের স্পোর্টস অধিগ্রহণের মাধ্যমে তারা বিশ্বখ্যাত আউটডোর ব্র্যান্ড আর্কটেরিক্স এবং সালোমন-এর নিয়ন্ত্রণ পায়। একই সঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্রের উইলসন স্পোর্টিং গুডসের মতো ব্র্যান্ডের সঙ্গেও যুক্ত হয়, যা তাদের উত্তর আমেরিকার ক্রীড়া বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সাহায্য করে।
সম্প্রতি অ্যানটা পুমা-তেও বড় ধরনের শেয়ার অধিগ্রহণ করে বৈশ্বিক ক্রীড়া সামগ্রী শিল্পে নিজেদের প্রভাব আরও বাড়িয়েছে। এই কৌশলকে বিশ্লেষকরা বলছেন “মাল্টি-ব্র্যান্ড গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজি”, যেখানে সরাসরি প্রতিযোগিতা না করে বিভিন্ন শক্তিশালী ব্র্যান্ডকে নিজের কাঠামোর মধ্যে এনে বাজার দখল বাড়ানো হয়।
বর্তমানে অ্যানটার চীনে ১২ হাজারের বেশি খুচরা দোকান রয়েছে। দেশের বাইরে ৪৬০টিরও বেশি আউটলেট পরিচালিত হচ্ছে এবং আগামী কয়েক বছরে শুধু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেই আরও এক হাজার দোকান খোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এর পাশাপাশি তারা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের জন্য লস অ্যাঞ্জেলেসের বেভারলি হিলস অঞ্চলে প্রথম ফ্ল্যাগশিপ স্টোর খুলেছে।
চীনের উৎপাদন খাতের বড় শক্তি হলো এর গভীর ও ঘন সাপ্লাই চেইন। জিনজিয়াং এবং ফুজিয়ান অঞ্চলে জুতার ফিতা, সোল, কাপড়, ডিজাইন ও লজিস্টিকস—সবকিছুই একসঙ্গে গড়ে উঠেছে। এই সমন্বিত শিল্প কাঠামো অ্যানটার মতো প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত ডিজাইন থেকে উৎপাদন এবং বাজারজাতকরণ পর্যন্ত সময় কমিয়ে আনতে সাহায্য করেছে।
এই শিল্প মডেল শুধু অ্যানটার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একই ব্যবস্থার ভেতর থেকে উঠে এসেছে শাওমি, ডিজেআই এবং বিওয়াইডি-এর মতো বৈশ্বিক প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠান, যারা প্রথমে অন্য কোম্পানির জন্য কাজ শুরু করে পরে নিজেরাই বিশ্ববাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনা উৎপাদন খাতের এই বিবর্তনই অ্যানটার মতো কোম্পানিকে শুধু সাবকন্ট্রাক্টর থেকে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডে পরিণত হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। ফেই কিন বলেন, বিদেশি ব্র্যান্ডের জন্য কাজ করার মাধ্যমে চীনা কোম্পানিগুলো শুধু উৎপাদনই শিখেনি, বরং দক্ষতা, গতি এবং ধারাবাহিকতা—সবকিছুই উন্নত করেছে।
অ্যানটার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন বৈশ্বিক ব্র্যান্ড ইমেজ তৈরি করা। পশ্চিমা বাজারে দীর্ঘদিন ধরে “মেড ইন চায়না” পণ্যের প্রতি একটি নির্দিষ্ট ধারণা রয়েছে—যা অনেক ক্ষেত্রে সস্তা বা নিম্নমানের হিসেবে দেখা হয়। এই ধারণা ভাঙতে অ্যানটা মাল্টি-ব্র্যান্ড কৌশল গ্রহণ করেছে, যেখানে তারা পশ্চিমা প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডগুলোকে ব্যবহার করে নতুন বাজারে প্রবেশ করছে।
ক্রীড়া বিপণন বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি নাইকি বা অ্যাডিডাসের মতো ব্র্যান্ডের সঙ্গে মুখোমুখি প্রতিযোগিতায় না গিয়ে অ্যানটা ধীরে ধীরে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে। তবে নাইকি এবং অ্যাডিডাস এখনো বৈশ্বিক বাজারে সবচেয়ে বড় অংশীদারিত্ব ধরে রেখেছে।
তারকা ক্রীড়াবিদদের সঙ্গে চুক্তি করাও ব্র্যান্ড শক্তিশালী করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মাইকেল জর্ডান ও নাইকির ঐতিহাসিক অংশীদারিত্বের মতো উদাহরণগুলো দেখিয়ে দিয়েছে, ব্র্যান্ড ইমেজ গঠনে অ্যাথলেটদের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। অ্যানটা ক্লে থম্পসন ও কাইরি আরভিংয়ের মতো খেলোয়াড়দের সঙ্গে কাজ করছে, তবে এখনো সেই পর্যায়ের বৈশ্বিক আইকনিক উপস্থিতি গড়ে তুলতে পারেনি।
ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিও অ্যানটার সম্প্রসারণে প্রভাব ফেলছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য উত্তেজনা, শুল্কনীতি এবং রাজনৈতিক সন্দেহ অনেক সময় চীনা ব্র্যান্ডগুলোর জন্য পশ্চিমা বাজারে প্রবেশ কঠিন করে তোলে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশ করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে অতিরিক্ত সতর্ক কৌশল নিতে হচ্ছে।
তবুও প্রতিষ্ঠানটি থেমে নেই। তাদের লক্ষ্য ধীরে ধীরে বৈশ্বিক ক্রীড়া সামগ্রী বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করা। অ্যানটার একজন মুখপাত্র বলেন, ক্রীড়া বাজার এমন জায়গা নয় যেখানে একজনের পতনেই অন্যের জয় নিশ্চিত হয়; বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র, যেখানে উদ্ভাবন ও ধারাবাহিকতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের মতে, অ্যানটার উত্থান শুধু একটি কোম্পানির গল্প নয়, বরং চীনের উৎপাদনভিত্তিক অর্থনীতি থেকে ব্র্যান্ডভিত্তিক বৈশ্বিক অর্থনীতিতে উত্তরণের একটি প্রতীক।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক: মো. সরোয়ার হোসেন মিঠু
নির্বাহী সম্পাদক: ইমতিয়াজ আহমেদ
বার্তা সম্পাদক: নাজমুল হোসেন লাভলু
ডিজিটাল ইনচার্জ: মো.সোবাহান মিয়া
Email: dokkhinerkhobor@gmail.com
Publisher & Editor In Chief:
Contact No:+880 1717607442
Address: Shibchar Powro Super Market, 2nd Flor, Shop No.44, Shibchar Sadar, Madaripur.
স্বত্ব দক্ষিণের খবর
Developed by Vida Team