দক্ষিণের খবর | www.dokkhinerarthonity.com
কে এম জয়নুল আবেদীন
প্রকাশ: বুধবার, ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:৩৭ পিএম
আপডেট: রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬, ১১:২০ এএম
যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ থেকে আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, অবকাঠামো উন্নয়ন, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য হ্রাস—সবই আমাদের অর্জন। এই সাফল্যগুলো বাস্তব এবং কষ্টার্জিত। কিন্তু এই অগ্রগতির আড়ালে একটি অস্বস্তিকর সত্য দীর্ঘদিন উপেক্ষিত থেকেছে: জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়নকে আমরা কখনোই আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রে স্থান দিইনি। ইতিহাস বলছে, এই অবহেলা জমতে জমতে শেষ পর্যন্ত ১৯৭৫, ১৯৮০, ১৯৯০, ২০০১ এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের মতো সময়ে আমাদের অর্জনকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
স্বাধীনতার পরের কয়েক দশকে আমাদের অগ্রাধিকার ছিল টিকে থাকা—খাদ্য, আশ্রয়, বিদ্যুৎ, সড়ক ও প্রাথমিক শিক্ষা। সেই সময়ে এটি ছিল প্রয়োজনীয় ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বাস্তববাদই অভ্যাসে পরিণত হয়। আমরা স্থাপনা নির্মাণে এগিয়েছি দ্রুত, কিন্তু মানুষ গড়ার কাজে পিছিয়ে পড়েছি। এর ফলেই আমাদের উন্নয়ন হয়েছে দৃশ্যমান কিন্তু ভঙ্গুর।
শিক্ষার প্রসার ঘটেছে সংখ্যায়, গুণগত মানে নয়। ডিগ্রির সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু সমালোচনামূলক চিন্তা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বাড়েনি। শিক্ষা হয়ে উঠেছে পরীক্ষাভিত্তিক ও সার্টিফিকেটনির্ভর। এর ফলে এমন এক প্রজন্ম তৈরি হয়েছে, যারা দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হিমশিম খায়। জনবহুল একটি দেশের জন্য এটি কোনো সামান্য ত্রুটি নয়—এটি একটি কাঠামোগত ঝুঁকি।
দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে আমরা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, উন্নত শিল্প বা জ্ঞানভিত্তিক সেবায় রূপান্তর করতে পারিনি। শিক্ষাব্যবস্থা ও শিল্পখাতের দুর্বল সংযোগের কারণে দেশে ও বিদেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ কমদক্ষ শ্রমে নিয়োজিত হয়েছে। রেমিট্যান্স অর্থনীতিকে সহায়তা করেছে ঠিকই, কিন্তু জাতির দরকষাকষির শক্তি ও আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারেনি।
সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে বিজ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে অবহেলার মাধ্যমে। গবেষণায় বিনিয়োগ নগণ্য, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনুসন্ধানের চেয়ে পাঠদানের চাপ বেশি, আর মৌলিক জ্ঞান সৃষ্টির পরিবেশ দুর্বল। যারা জ্ঞান সৃষ্টি করে না, তারা চিরকাল অন্যের জ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল থাকে। আধুনিক বিশ্বে এই নির্ভরশীলতাই দুর্বলতার নাম।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যোগাযোগ দক্ষতার সংকট, বিশেষ করে ইংরেজি ভাষায়। বহু বছর পড়াশোনা করেও কার্যকর যোগাযোগ দক্ষতা গড়ে ওঠেনি। এর ফলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, গবেষণা, কূটনীতি ও বৈশ্বিক আলোচনায় আমাদের উপস্থিতি সীমিত। আজকের বিশ্বে দুর্বল যোগাযোগ মানে কেবল দুর্বলতা নয়—এটি একটি কৌশলগত ঘাটতি।
এই অবস্থার পেছনে রয়েছে কিছু গভীর সাংস্কৃতিক ও নীতিগত সমস্যা—মুখস্থবিদ্যা, শিক্ষক সমাজের অবমূল্যায়ন, ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত রাজনীতিকরণ, বিতর্ক ও প্রশ্ন করার দুর্বল সংস্কৃতি। যখন প্রশ্ন করা নিরুৎসাহিত হয়, তখন যুক্তির জায়গায় স্লোগান আসে, আর প্রমাণের জায়গায় আবেগ। ইতিহাস বলে, এখান থেকেই অস্থিরতার জন্ম।
অবশ্য অগ্রগতি একেবারেই হয়নি—তা বলা অন্যায় হবে। ডিজিটাল সংযোগ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, ফ্রিল্যান্সিং ও উদ্যোক্তা খাতে কিছু সাফল্য দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এগুলো বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো; পুরো ব্যবস্থার রূপান্তর নয়। একটি জাতি বিচ্ছিন্ন সাফল্যের ওপর ভর করে ভবিষ্যৎ নিরাপদ করতে পারে না।
এই বাস্তবতায় নতুন করে দেশপ্রেমের অর্থ বুঝতে হবে—বিশেষ করে যারা সামাজিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন। আজ দেশপ্রেম মানে শুধু অতীত স্মরণ বা প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান নয়; দেশপ্রেম মানে অর্জনগুলো টিকিয়ে রাখার মতো বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি গড়ে তোলা। এর জন্য প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষা, গবেষণার মর্যাদা, মুক্ত চিন্তার পরিবেশ এবং দক্ষ যোগাযোগ।
নীতিনির্ধারকদের প্রতি বার্তাটি স্পষ্ট হওয়া জরুরি। মানবসম্পদ কোনো আলাদা খাত নয়—এটাই সব খাতের ভিত্তি। বাজেটে এর প্রতিফলন থাকতে হবে। শিক্ষার সংস্কার মানে শুধু ভর্তি বাড়ানো নয়, গভীরতা বাড়ানো। গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে ও রাজনীতির অতিরিক্ত প্রভাব থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে রক্ষা করতে হবে। ইংরেজি ও যোগাযোগ দক্ষতাকে পরীক্ষার বিষয় নয়, জীবনের দক্ষতা হিসেবে শেখাতে হবে।
সাধারণ মানুষের জন্যও একটি বার্তা আছে। শিক্ষা কেবল চাকরির জন্য নয়—সমাজ বোঝা, ভ্রান্ত তথ্য চেনা এবং নেতৃত্বকে প্রশ্ন করার শক্তি অর্জনের জন্য। চিন্তাশীল জনগণই স্থিতিশীল রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ।
বাংলাদেশ আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আমরা চাইলে স্বল্পমেয়াদি চিন্তায় আবার পরিচিত সংকটে ফিরতে পারি, অথবা চাইলে বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়নে দৃঢ় বিনিয়োগ করে টেকসই অগ্রগতির পথ বেছে নিতে পারি। এই দায়িত্ব শুধু নীতিনির্ধারকদের নয়। প্রতিটি প্রজন্মের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় শিক্ষার্থীদেরও মনে রাখতে হবে—শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাদের শেখার স্থান। অন্যের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার হাতিয়ার না হয়ে শিক্ষার্থীদের উচিত পড়াশোনা, গবেষণা ও দক্ষতা উন্নয়নের পরিবেশ রক্ষা করা। সচেতন নাগরিক হওয়া আর শিক্ষা বিসর্জন দেওয়া এক বিষয় নয়।
আমাদের সিদ্ধান্তই ঠিক করবে অর্জন টিকবে, নাকি আবার হারিয়ে যাবে। যে জাতি নিজের বুদ্ধিকে অবহেলা করে, সে জাতি নিজের ভবিষ্যৎ বন্ধক রাখে। এখনই সময়—আগামীকালের অপেক্ষা নয়।
লেখক: প্রকৌশলী কে এম জয়নুল আবেদীন
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক: মো. সরোয়ার হোসেন মিঠু
নির্বাহী সম্পাদক: ইমতিয়াজ আহমেদ
বার্তা সম্পাদক: নাজমুল হোসেন লাভলু
ডিজিটাল ইনচার্জ: মো.সোবাহান মিয়া
Email: dokkhinerkhobor@gmail.com
Publisher & Editor In Chief:
Contact No:+880 1717607442
Address: Shibchar Powro Super Market, 2nd Flor, Shop No.44, Shibchar Sadar, Madaripur.
স্বত্ব দক্ষিণের খবর
Developed by Vida Team