দক্ষিণের খবর | www.dokkhinerarthonity.com
কে এম জয়নুল আবেদীন
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৬:৩০ পিএম
আপডেট: রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬, ১১:২০ এএম
এই উপলব্ধিই আজকের আন্তর্জাতিক অভিবাসনের বাস্তব চিত্র। ১৮ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস পালিত হয়, যা বাংলাদেশের বিজয় দিবস ১৬ ডিসেম্বরের ঠিক দুই দিন পর। এই নৈকট্য কাকতালীয় নয়; বরং এটি আমাদের ইতিহাস ও বর্তমান বাস্তবতার গভীর যোগসূত্রের কথাই মনে করিয়ে দেয়।
মানুষের ইতিহাস মূলত চলমান মানুষের ইতিহাস। নিরাপত্তা, খাদ্য, কাজ, মর্যাদা ও স্বাধীনতার খোঁজে মানুষ যুগ যুগ ধরে স্থান বদলেছে। কিন্তু আজকের পৃথিবীতে অভিবাসনের চরিত্র আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জটিল ও বেদনাদায়ক। বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৩০ কোটির বেশি মানুষ নিজ দেশের বাইরে বসবাস করছে এবং ১২ কোটিরও বেশি মানুষ যুদ্ধ, নিপীড়ন, রাজনৈতিক সহিংসতা, জলবায়ু দুর্যোগ ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত। এগুলো কেবল সংখ্যা নয়—এগুলো অগণিত জীবনের গল্প, যাদের পেছনে ফেলে আসা বাড়ি আর সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
অনেক মানুষের জন্য অভিবাসন এখনো আশার পথ। কাজের সন্ধানে বিদেশে যাওয়া শ্রমিকরা পরিবার ও দেশের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখছে। বাংলাদেশের প্রবাসী কর্মীরা রেমিট্যান্স পাঠিয়ে লক্ষ লক্ষ পরিবারের জীবনে স্থিতি এনে দিচ্ছে। কেউ পড়াশোনা বা দক্ষতা অর্জনের জন্য যায়, কেউ নতুন সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখে। এই অভিবাসন মানবিক সাহস ও স্বপ্নের প্রতিফলন।
কিন্তু আজ বিপুল সংখ্যক মানুষের জন্য অভিবাসন কোনো স্বপ্ন নয়—এটি জীবন বাঁচানোর শেষ চেষ্টা। যুদ্ধ, দমন-পীড়ন, জাতিগত নিধন, দারিদ্র্য ও জলবায়ু পরিবর্তন মানুষকে ঘরছাড়া করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রতি বছর বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও খরার কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। বাংলাদেশ এই বাস্তবতা প্রতিদিন অনুভব করছে—নদীভাঙন ও উপকূলীয় দুর্যোগে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি বেড়ে চলেছে, যা ধীরে ধীরে বৃহত্তর অভিবাসনের চাপ তৈরি করছে।
এই বৈশ্বিক বাস্তবতার সবচেয়ে করুণ উদাহরণগুলোর একটি হলো রোহিঙ্গা সংকট। মিয়ানমারে দীর্ঘদিনের নিপীড়ন ও সহিংসতার ফলে লাখ লাখ রোহিঙ্গা জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া এই জনগোষ্ঠী আজও অনিশ্চয়তার মধ্যে বাস করছে। বাংলাদেশ মানবিক দায়িত্ব থেকে তাদের আশ্রয় দিয়েছে, যদিও এটি একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগতভাবে বিশাল চাপের সৃষ্টি করেছে। এই সংকট প্রমাণ করে—জোরপূর্বক অভিবাসন কেবল একটি দেশের সমস্যা নয়; এটি একটি আন্তর্জাতিক দায়িত্ব, যা সমানভাবে ভাগ না হলে মানবিক সংকট দীর্ঘস্থায়ী হয়।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—আজকের পৃথিবীতে অভিবাসন অনেক ক্ষেত্রে মানুষের তৈরি একটি মানবিক বিপর্যয়, এমনকি রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। কোথাও যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করা হচ্ছে, কোথাও সংখ্যালঘুদের পরিকল্পিতভাবে বিতাড়িত করা হচ্ছে। এরপর সেই বাস্তুচ্যুত মানুষদের ব্যবহার করা হয় রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি, ভয় দেখানো কিংবা দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে। এতে অভিবাসীরা মানুষ হিসেবে নয়, বরং সমস্যা বা হুমকি হিসেবে চিত্রিত হয়।
এই বাস্তবতা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ১৯৭১ সালে সহিংসতা ও নিপীড়নের মুখে বিপুলসংখ্যক মানুষ জীবন রক্ষার জন্য সীমান্ত পেরিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল। সেই কঠিন সময়ে প্রতিবেশী দেশসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মানবিক সহানুভূতি ও সহযোগিতা অসংখ্য প্রাণ রক্ষা করেছিল। এই ইতিহাস আমাদের শেখায়—শরণার্থী মানেই বোঝা নয়; তারা পরিস্থিতির শিকার মানুষ।
বিজয় দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জোরপূর্বক অভিবাসন সবসময় রাষ্ট্রব্যবস্থার ব্যর্থতার ফল। যেখানে ন্যায়বিচার নেই, সেখানে মানুষ চলে যায়। যেখানে মর্যাদা নেই, সেখানে মানুষ পালাতে বাধ্য হয়। কঠোর সীমান্ত বা কাঁটাতার মানুষকে থামাতে পারে না, যদি তার জীবন হুমকির মুখে থাকে।
আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস তাই কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি আত্মসমালোচনার সুযোগ। অভিবাসনকে ভয়ের চোখে নয়, মানবাধিকারের আলোয় দেখতে হবে। নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনের পথ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে যুদ্ধ, দারিদ্র্য, বৈষম্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের মূল কারণগুলো সমাধানে আন্তরিক হতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য এই উপলব্ধি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। একটি শরণার্থীদের ইতিহাস থেকে জন্ম নেওয়া জাতি হিসেবে আমাদের নৈতিক দায়িত্ব আছে—মানবিকতা, সহমর্মিতা ও ন্যায়ের পক্ষে কথা বলা। কারণ খুব বেশি দিন আগে নয়, আমরাও ছিলাম বাস্তুচ্যুত মানুষের কাতারে। অভিবাসন কখনো আশার ফল, আবার কখনো মানবিক ব্যর্থতার দাগ। কোনটি প্রাধান্য পাবে, তা নির্ভর করে আমাদের সিদ্ধান্ত, রাজনীতি এবং মানবিক বিবেকের ওপর।
লেখক: প্রকৌশলী
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক: মো. সরোয়ার হোসেন মিঠু
নির্বাহী সম্পাদক: ইমতিয়াজ আহমেদ
বার্তা সম্পাদক: নাজমুল হোসেন লাভলু
ডিজিটাল ইনচার্জ: মো.সোবাহান মিয়া
Email: dokkhinerkhobor@gmail.com
Publisher & Editor In Chief:
Contact No:+880 1717607442
Address: Shibchar Powro Super Market, 2nd Flor, Shop No.44, Shibchar Sadar, Madaripur.
স্বত্ব দক্ষিণের খবর
Developed by Vida Team