দক্ষিণের খবর | www.dokkhinerarthonity.com
কে এম জয়নুল আবেদীন
প্রকাশ: শনিবার, ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:৫৯ এএম
আপডেট: রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬, ১১:২০ এএম
কিন্তু দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা ও আসিয়ানভুক্ত দেশসহ গ্লোবাল সাউথের মানুষের কাছে মূল প্রশ্নটি থেকেই যায়—এই বৈশ্বিক আলোচনাগুলো সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কী পরিবর্তন আনে? দাভোস দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে পারে, কিন্তু শাসন নিশ্চিত করতে পারে না। সেই দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত জাতীয় নেতৃত্ব, প্রতিষ্ঠান ও সমাজের ওপরই বর্তায়।
দাভোসের আলোচনাগুলো একটি বিভক্ত বিশ্বের চিত্র তুলে ধরেছে, যেখানে বড় শক্তিগুলো ক্রমেই নিজেদের স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ নতুন প্রযুক্তি দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু শ্রমজীবী মানুষ ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির সুরক্ষায় যথেষ্ট নীতিগত প্রস্তুতি নেই। বৈষম্য বাড়ছে, আর সর্বত্রই জনআস্থা ক্ষয় হচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এগুলো তাত্ত্বিক বিষয় নয়—এগুলো খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, জলবায়ু সুরক্ষা, শিক্ষা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। এই বাস্তবতায় বৈশ্বিক সমাধানের অপেক্ষায় বসে থাকা আর সম্ভব নয়। গ্লোবাল সাউথকে এখন শাসন করতে হবে স্পষ্টতা, সাহস ও মানবিকতা নিয়ে।
দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নশীল দেশগুলো বৈশ্বিক ফোরামে অংশ নিয়েছে, কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই সিদ্ধান্ত নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পেরেছে। এই অবস্থার পরিবর্তন জরুরি। দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা ও আসিয়ান অঞ্চলের দেশগুলোকে বাণিজ্য, জলবায়ু অর্থায়ন, শ্রম অভিবাসন ও ডিজিটাল শাসনব্যবস্থার মতো বিষয়ে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করতে হবে। সম্মিলিত অবস্থান ছোট অর্থনীতিগুলোর কণ্ঠকে শক্তিশালী করে এবং বড় শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমায়। আজকের ভালো শাসন মানে কেবল অভ্যন্তরীণ প্রশাসন নয়, বৈশ্বিক আলোচনায় নিজের স্বার্থ সচেতনভাবে তুলে ধরার সক্ষমতাও।
দাভোসে প্রযুক্তিকে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু অন্তর্ভুক্তি ছাড়া প্রযুক্তি বৈষম্য আরও গভীর করতে পারে। বাংলাদেশের মতো দেশের ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রযুক্তিকে অবশ্যই জনকল্যাণে ব্যবহার করতে হবে—স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, সরকারি সেবা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সুযোগ বাড়াতে। আফ্রিকার ডিজিটাল ভবিষ্যৎ কেবল সংযোগে নয়, দক্ষতা ও স্থানীয় উদ্ভাবনের ওপর নির্ভরশীল। আসিয়ান দেশগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য এমন নীতিমালা তৈরি করতে পারে, যা একদিকে উৎপাদনশীলতা বাড়াবে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান সুরক্ষিত রাখবে। প্রযুক্তি যেন মানুষের উন্নতির হাতিয়ার হয়, বঞ্চনার কারণ নয়।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা একাই যথেষ্ট নয়। অনেক উন্নয়নশীল দেশে ভালো প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান থাকলেও বিপুল জনগোষ্ঠী অনিরাপদ কাজ ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপে আছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন মানে কর্মসংস্থানের মান, দক্ষতা উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষায় বিনিয়োগ। ক্ষুদ্র কৃষক, স্থানীয় শিল্প ও তরুণ উদ্যোক্তাদের সহায়তা অর্থনীতিকে আরও স্থিতিশীল করে। উন্নয়নের সাফল্য কেবল সংখ্যায় নয়, মানুষের মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ বিশ্বাসে পরিমাপ করা উচিত।
জলবায়ু পরিবর্তন শাসনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। দাভোসে প্রতিশ্রুতির কথা শোনা গেলেও বাস্তবায়ন এখনও ধীর। জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য জলবায়ু কার্যক্রমকে আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর পুরোপুরি নির্ভর করলে চলবে না। জাতীয় পরিকল্পনা, স্থানীয় শাসন ও কমিউনিটি পর্যায়ে স্থিতিস্থাপকতা গড়ে তুলতে হবে। নদী, উপকূল, বন ও শহর রক্ষা করা পরিবেশবাদ নয়—এটি টিকে থাকার কৌশল।
এই সব চ্যালেঞ্জের কেন্দ্রে রয়েছে আস্থা। মানুষ তখনই সরকারকে বিশ্বাস করে, যখন শাসন স্বচ্ছ, ন্যায়সঙ্গত ও সাড়া দেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন হয়। দুর্নীতি, বঞ্চনা ও নীরবতা রাষ্ট্রকে বাইরের যেকোনো হুমকির চেয়ে বেশি দুর্বল করে। অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনের অর্থ নাগরিকের কথা শোনা, প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা এবং ক্ষমতাকে জনস্বার্থে ব্যবহার করা।
বাংলাদেশের জন্য এসব শিক্ষা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি আজ সম্ভাবনা ও ঝুঁকির এক সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে—একদিকে দারিদ্র্য হ্রাস ও প্রবৃদ্ধির সাফল্য, অন্যদিকে জলবায়ু ঝুঁকি, বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তা এবং সম্মানজনক সুযোগ খুঁজতে থাকা এক তরুণ জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশের আসল শক্তি কেবল প্রবৃদ্ধির হার নয়, বরং তার সহনশীলতা, সামাজিক সংহতি এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক সমাধানের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথটি হতে হবে সহমর্মিতায় ভর করা রাষ্ট্রনায়কসুলভ শাসন—যে শাসন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শোনে, মুনাফার আগে সুরক্ষা দেয়, এবং সম্প্রসারণের আগে অন্তর্ভুক্তিকে গুরুত্ব দেয়। জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে, স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করে, মানবসম্পদে বিনিয়োগ করে এবং প্রযুক্তিকে জনকল্যাণে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ প্রমাণ করতে পারে—অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন কোনো স্লোগান নয়, বরং বাস্তব অনুশীলন। এমন এক সময়ে, যখন বৈশ্বিক নেতৃত্ব বিভক্ত ও দূরবর্তী মনে হয়, বাংলাদেশ ও গ্লোবাল সাউথ মানবতার জন্য একটি মূল্যবান বার্তা দিতে পারে—ন্যায়, আস্থা ও মানব মর্যাদার ওপর দাঁড়ানো উন্নয়ন কেবল সম্ভবই নয়, বরং সবার ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য।
- প্রকৌশলী কে এম জয়নুল আবেদীন ।
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক: মো. সরোয়ার হোসেন মিঠু
নির্বাহী সম্পাদক: ইমতিয়াজ আহমেদ
বার্তা সম্পাদক: নাজমুল হোসেন লাভলু
ডিজিটাল ইনচার্জ: মো.সোবাহান মিয়া
Email: dokkhinerkhobor@gmail.com
Publisher & Editor In Chief:
Contact No:+880 1717607442
Address: Shibchar Powro Super Market, 2nd Flor, Shop No.44, Shibchar Sadar, Madaripur.
স্বত্ব দক্ষিণের খবর
Developed by Vida Team