দক্ষিণের খবর | www.dokkhinerarthonity.com
কে এম জয়নুল আবেদীন
প্রকাশ: শনিবার, ১৫ নভেম্বর ২০২৫, ১১:৪৭ এএম
আপডেট: রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬, ১১:২০ এএম
বাংলাদেশকে নিয়ে বিশ্বমঞ্চে দীর্ঘদিন ধরেই একটি ইতিবাচক বর্ণনা প্রচলিত। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা, দ্রুত বর্ধমান ভোক্তা শ্রেণি, দক্ষ মানবসম্পদ, এবং এশিয়ার বন্দরনির্ভর বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে আমাদের অবস্থান অনেকেই বিশেষভাবে মূল্যায়ন করেছেন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা বহুবার বলেছেন, সঠিক নীতি ও স্থিতি বজায় রাখতে পারলে বাংলাদেশ ২০৩৫ সালের মধ্যেই বিশ্বের শীর্ষ ২৫ অর্থনীতির তালিকায় উঠে আসবে। এই আশাবাদ আমাদের জাতীয় আত্মবিশ্বাসকে শক্তিশালী করে, বিশেষ করে যখন আমরা দেখি—গার্মেন্টস শিল্প, প্রবাসী রেমিট্যান্স, কৃষি উৎপাদন, ডিজিটাল সেবা এবং তরুণ প্রজন্মের উদ্যোক্তা উদ্যোগ নতুন নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিচ্ছে। এগুলো আমাদের দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী ও টেকসই করার মূল ভিত্তি।
কিন্তু দেশের ভেতরের বাস্তবতা এখন অনেকটাই চাপের। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক পরিবর্তন, প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক অবিশ্বাস অর্থনীতিতে মনস্তাত্ত্বিক ধাক্কা সৃষ্টি করেছে। বিনিয়োগকারীরা অপেক্ষারত, শিল্প মালিকেরা হিসাব কষছেন, আর সাধারণ মানুষ ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। যে অর্থনীতি একসময় ‘বাঙালি মিরাকল’ নামে পরিচিত ছিল, তা এখন প্রশ্নের মুখোমুখি—অগ্রগতি কি সাময়িক থমকে গেছে, নাকি এটি একটি অতিবাহিত ঝড়?
এই প্রশ্নের উত্তর পরিষ্কার। বাংলাদেশ এখন যে অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে, তা কোনোভাবেই অর্থনীতির মৌলিক শক্তিকে দুর্বল করে দেয়নি। বরং অস্থিরতার মেঘ কেটে গেলে সম্ভাবনার আকাশ আবারও উজ্জ্বল হতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন বড় তিনটি বিষয়—উৎপাদন লাইন সচল করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, এবং রাজনৈতিক স্থিতি নিশ্চিত করা। এগুলো কোনো বিলাসিতা নয়; আধুনিক অর্থনীতির জন্য এগুলোই ভিত্তি।
প্রথমত, উৎপাদন লাইন সক্রিয় রাখতে হবে। দেশের কারখানা, কৃষিখাত, এবং ক্ষুদ্র শিল্পগুলো বাঁচিয়ে রাখাই এখন জরুরি। শিল্প এলাকা, বন্দর, সড়ক ও কাঁচামাল পরিবহনে অস্থিরতা কমাতে না পারলে রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং নতুন বাজার হারানোর ঝুঁকি বাড়বে। শ্রমিকদের নিরাপত্তা, উদ্যোক্তাদের আস্থা এবং সাপ্লাই চেইনের স্থিতি—সবই পুনরুদ্ধার করতে হবে জরুরি ভিত্তিতে। শুধু বড় শিল্প নয়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা ক্ষেত্রগুলোও দেশের অর্থনৈতিক স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সমান গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয়ত, আইনের শাসন স্পষ্ট ও দৃশ্যমান হতে হবে। ব্যবসার সিদ্ধান্ত নির্ভর করে পূর্বাভাসযোগ্য পরিবেশের ওপর। আইন প্রয়োগে বৈষম্য, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বা প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের পিছিয়ে দেয়। যদি দেশকে ২০৩৫ সালের উচ্চতর লক্ষ্য ছুঁতে হয়, তবে সকল নাগরিক—ধনী গরিব নির্বিশেষে—আইনের সমান সুরক্ষা ও ন্যায়বিচার পেতে হবে। এটি শুধু বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করবে না, বরং অভ্যন্তরীণ ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে নিরাপত্তা বোধ ও আত্মবিশ্বাস দেবে।
তৃতীয়ত, রাজনৈতিক স্থিতি অপরিহার্য। দেশের অর্থনীতি যত শক্তিশালীই হোক, যদি রাজপথ অস্থির থাকে, যদি ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়, তাহলে উন্নয়নের গতি বাধাগ্রস্ত হবেই। রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্বের দায়িত্ব এখন দ্বিগুণ—ক্ষমতার প্রতিযোগিতা যেন রাষ্ট্রের স্থিতিকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে। নতুন প্রজন্ম যেসব আকাঙ্ক্ষা নিয়ে পরিবর্তনের ডাক দিয়েছে, তা অবশ্যই গুরুত্ব পাওয়া উচিত, তবে সেই পরিবর্তন হতে হবে কাঠামোবদ্ধ, শান্তিপূর্ণ এবং রাষ্ট্রযন্ত্রকে কার্যকর রেখে।
এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য ভুলে গেলে চলবে না—দায়িত্বের কেন্দ্রে আছেন নীতিনির্ধারকরা, কিন্তু সফলতার চাবিকাঠি আছে জনগণের হাতে। রাষ্ট্র তার কাজ করবে, কিন্তু জনগণ যদি সহনশীলতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা না দেখায়—তবে কোনো অর্থনৈতিক রোডম্যাপই বাস্তবে রূপ নেবে না। দেশের সাধারণ মানুষই এদেশের প্রাণশক্তি; তারা চাইলে স্থিতি ফিরতে সময় লাগে না।
বাংলাদেশ এক কঠিন সময় অতিক্রম করছে—এটা সত্য। কিন্তু কঠিন সময় মানেই ব্যর্থতা নয়। কখনো কখনো সংকটই জাতিকে নতুন করে ভাবতে শেখায়, শক্তিশালী রূপান্তরের সুযোগ সৃষ্টি করে। আজকের অস্থিরতা তাই আগামী দিনের নতুন শুরুর ভিত্তিও হতে পারে—যদি আমরা সবাই চাই। আমাদের সামনে সম্ভাবনার দিগন্ত খোলা, আমাদের শক্তি অটল—এখন শুধু প্রয়োজন নীতি, শৃঙ্খলা ও জাতীয় ঐক্যের হাত ধরে এগিয়ে যাওয়া। বাংলাদেশ পারে, এবং জনগণের অংশগ্রহণ থাকলে অবশ্যই পারবে।
লেখক: প্রকৌশলী
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক: মো. সরোয়ার হোসেন মিঠু
নির্বাহী সম্পাদক: ইমতিয়াজ আহমেদ
বার্তা সম্পাদক: নাজমুল হোসেন লাভলু
ডিজিটাল ইনচার্জ: মো.সোবাহান মিয়া
Email: dokkhinerkhobor@gmail.com
Publisher & Editor In Chief:
Contact No:+880 1717607442
Address: Shibchar Powro Super Market, 2nd Flor, Shop No.44, Shibchar Sadar, Madaripur.
স্বত্ব দক্ষিণের খবর
Developed by Vida Team